Monday 22 April 2024

সায়েমের ক্ষমতা গ্রহণ এবং জিয়ার ক্ষমতা দখল


ভুমিকা

বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে ঠিক কোন প্রেক্ষাপটে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে ১৯৭৭ সালের ২১ শে এপ্রিল ক্ষমতা ছেড়েছিলেন; এই বিষয়েই আজকের এই দীর্ঘ লেখাটি। সায়েমের ক্ষমতা ছাড়বার ৩৭ বছর পূর্তি হলো গত ২১ শে এপ্রিল ২০২৪ ইং তারিখে। 

(উল্লেখ্য যে, আমি উপরে অবৈধ শব্দটি ব্যবহার করেছি এই বিষয়ে উচ্চ আদালতের ৫ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হয়েছে, সে রায়কে রেফারেন্স ধরে। উক্ত রায়ে খন্দকার মোশতাক আহমদ, আবু  সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও জিয়াউর রহমানের  শাসনকে অবৈধ ঘোষনা করা হয়েছে। প্রাসঙ্গিকভাবে এও বলে নেয়া ভালো যে, ৭ম সংশোধনীকেও উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষনা করেছে ফলে এরশাদের ক্ষমতা দখলও উচ্চ আদালতের রায়ের বদৌলতে অবৈধ বলে সূচিত করাই যৌক্তিক ) 

যখনই বিচারপতি সায়েমের অবৈধ ক্ষমতা গ্রহণ প্রসঙ্গ আসবে ঠিক তখনই স্বাভাবিকভাবেই ১৯৭৫-এর ৩ ও ৭ নভেম্বরে ঘটে যাওয়া সমস্ত বিষয়াদি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কেননা এই বিষয়ের বিস্তারিত আলাপ ছাড়া মোশতাক কেন তার অবৈধ ক্ষমতা ছেড়েছে আর তার পর পরই ঠিক কিভাবে বিচারপতি সায়েম ক্ষমতার প্রাঙ্গনে এসে হাজির হলেন তা বোঝা যাবে না। ৩ ও ৭ নভেম্বরের পেছনের প্রেক্ষাপট দীর্ঘভাবে এই সুনির্দিষ্ট লেখায় না লিখেও এর একটা সারাংশ টানা যেতে পারে সে সময়ের প্রেক্ষাপট বুঝবার জন্য।

Wednesday 3 February 2021

শেখ হাসিনাকে নিয়ে মিথ্যাচারঃ রায়ের মধ্যে রংহেডেড/Wrongheaded বিতর্ক


আপীলেট ডিভিশান-এর একটি রায়ে নাকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রঙ-হেডেড/wrongheaded এই শব্দ দিয়ে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো, এমন একটি গুজব আপনি অনলাইন কিংবা অফলাইনে প্রায়-ই শুনতে পাবেন। আমার এই লেখা যারা পড়ছেন তারা হয়ত অনেকেই এই গুজব অনেকবার শুনে থাকবেন।

আমাকে এই গুজবের সামনে প্রথমবারের মত পড়তে হয়েছিলো ২০১২ কিংবা ২০১৩ সালের যুক্তরাজ্যভিত্তিক বাংলা টিভি চ্যানেল, চ্যানেল-এস এর এক টিভি টকশোতে। সেই টকশো তে আমার প্রতিপক্ষ ছিলেন বি এন পির যুক্তরাজ্য শাখার সভাপতি এম এ মালিক সাহেব।
দীর্ঘদিন ধরে এই গুজবটি চলে আসলেও আমি আজ পর্যন্ত কোনো আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মী-আইনজীবি কাউকেই দেখলাম না এই গুজবটা সম্পর্কে একটা শব্দ উচ্চারন করেছেন।
জনসাধারণের কাছে এই মিথ্যাচার তুলে ধরবার জন্য এই যে আওয়ামীলীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগে এত এত আইনজীবি রয়েছেন তাঁরা আসলে করেনটা কি?
আমি আওয়ামীলীগ এবং এর অংগ সংগঠনের দিকে আঙ্গুল তুলেছি একটা কারনেই যে, দেশের এত এত আইনজীবি কর্মী থাকার পরেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কেন একটা মিথ্যে অপবাদ নিয়ে এতটা বছর ঘুরতে হবে বা হয়েছে?
আজকের এই লেখাটার আগে আমি তন্ন তন্ন করে অনলাইনে খুঁজেছি, কিন্তু এই মিথ্যেকে খোলাশা করে একটি লেখাও কোনো আওয়ামী আইনজীবি বা কর্মী লিখেন নি। ব্যাপারটা হতাশার, কষ্টের এবং একই সাথে বিষ্ময়েরও বটে!
আমি থাকি যুক্তরাজ্যে। চাইলেই আমি বাংলাদেশের অনেক নথি-পত্র, মামলা ইত্যাদি এক্সেস করতে পারিনা। একটা মামলা বের করতে হলে বাবাকে ফোন দিতে হয়, বন্ধুদের ফোন দিতে হয়, পরিচিত-অপরিচিত মানুষদের ফোন দিতে হয়। ডি এল আর,‌ বি এল ডি ইত্যাদি খুঁজতে হয়। আমার বাবা বৃদ্ধ মানুষ, তাঁকে বলাটাও আমার জন্য কষ্টের।
আমার গত পোস্টের একটা বিতর্কের সূত্র ধরে এই 'রঙ-হেডেড' গুজবটা আবার সামনে আসলো এবং এইবার ভাবলাম এই গুজবের একটা কবর রচনা করি। আমার এই লেখাটা সারাজীবন অনলাইনে রেফারেন্স হিসেবে থেকে যাক এবং একটা মিথ্যার অবসান হোক।
বীর উত্তম কর্ণেল তাহেরকে সামরিক আদালতে কতটা বর্বর উপায়ে খুন করা হয়েছে, এমন বিষয়ক একটি পোস্টে বিলুপ্ত বি এন পি সমর্থক মামুন নামের এক ভদ্রলোক আমাকে আবারো এই প্রশ্নের সামনে নিয়ে এসে জানিয়ে গেলেন আদালতে নাকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে রঙ-হেডেড বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে।
আমি সেই ব্যাক্তিকে বললাম রায়টা দেখান। কিন্তু এইসব জামাত-বি এন পি-শিবিরের লোকজন কি আসলে প্রমাণ নিয়ে কথা বলে? এরা কথা বলে বাতাসের উপর। তলোয়ারও চালায় বাতাসে। ফলে অনেকবার অনুরোধ করেও সেই প্রমাণ কিংবা রায় আমি পাইনি।
তো কি আর কি করা... নিজেই নেমে গেলাম সেই রায় খুঁজতে এবং শেষ পর্যন্ত সেই রায়ের ঠিকানা-সাকিন সব পেয়ে গেলাম। বিস্তারিত দেবার পর আমার বাবা তাঁর চেম্বার থেকে সেই রায় জোগার করে দিলেন।
এই রায় রয়েছে ৫১ নাম্বার ডি এল আর ( ঢাকা ল' রিপোর্ট)-এর ৬৮ নাম্বার পৃষ্ঠায়। মোট ১৩ টি প্যারাগ্রাফের একটি শর্ট অবজার্ভেশন। এই মামলায় উপস্থিত বিচারপতিরা ছিলেন যথাক্রমে-
(মাননীয় বিচারপতি)
১) এ টি এম আফজাল (প্রধান বিচারপতি)
২) মুস্তাফা কামাল
৩) লতিফুর রহমান
৪) বিমলেন্দু বিকাশ রায় চৌধুরী
৫) এ এম মাহমুদুর রহমান
রায়টি দেয়া হয়েছিলো ৪-ই মার্চ ১৯৯৯ ইং তারিখে।
হাবিবুল ইসলাম ভুইঁইয়া নামের একজন সিনিয়ার আইনজীবি যিনি ছিলেন তৎকালীন সূপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশানের সভাপতি, তিনি একটি অভিযোগ আনেন তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে।
কি ছিলো জনাব ভুইঁয়ার অভিযোগ?
অভিযোগ ছিলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৯ শে জানুয়ারী ১৯৯৯ ইং তারিখে ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে গণভবনে একটি সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য দেন সেটির কিছু অংশ আদালত অবমাননার সামিল।
ফলে তিনি উপযাজক হয়ে নিজেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার একটি অভিযোগ দায়ের করে বসেন।
সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই পরবর্তীতে আপীলেট ডিভিশান তাঁদের রায় প্রদান করেন।
গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছিলেন সেটি পরদিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও মামলার ফরিয়াদী জনাব ভুইঁয়া কেবলমাত্র দৈনিক দিনকাল ও জামাতী মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত সংবাদ দিয়েই তার আবেদনটি করেন।
সেখান থেকেই আমরা জানতে পারি যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দুই দিনে হাইকোর্টে এত বেশি সংখ্যক জামিন হয়েছে, এই মর্মে মন্তব্য করেন এবং তাঁর বিষ্ময় প্রকাশ করেন যে কিভাবে মাত্র দুইদিনে প্রায় ১২০০ জনের জামিন হয়।
আর প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই মন্তব্য কেন করেছেন সেটিও আমরা প্রদত্ত রায়ে জানতে পারি যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, টিভিতে নানাবিধ রিপোর্ট দেখে প্রধানমন্ত্রী সেই মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রীর যে বক্তব্য আদালতে কোট করা হয় উপরে উল্লেখিত পত্রিকার সূত্রে, তা হচ্ছে-
Daily ‘Dinkal’ পত্রিকায় খবর লেখা হয়…. “গত ২৫ ও ২৬ আগষ্ট দুদিনে হাইকোর্টে ১২শ মামলার জামিন হয়েছিল। এটা কখনো হতে পারে না। এরপর কোর্ট পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেননি।”
Daily ‘Sangram’পত্রিকায় খবর লেখা হয়….“বাংলাদেশের হাইকোর্টের এমন অবস্থা করে রেখে গেছে পূর্বের সরকার যে, দুই দিনে ১২শ মামলার জামিন হয়ে যায়। কিভাবে হলো, কেন হলো? এটা কোনদিন হয়? এটা প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনা হয়েছে। যদিও কোর্ট চেঞ্জ করা হয়েছে কিন্তু কোন ব্যবস্থা তিনি নেননি। যদি তদন্ত করা হতো এবং ব্যবস্থা নেয়া হতো তবে জুডিসিয়ারী অনেক দায় দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেত। জুডিসিয়ারী সম্পর্কে মানুষের কোন সন্দেহ দেখা দিত না।”
আদালত তাঁর রায়ের ৪ নাম্বার প্যারায় বলেন যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপরে উল্লেখিত বক্তব্য কেবলমাত্র ঐ দুটি পত্রিকায় এসেছে কিন্তু দেশের অন্য পত্রিকায় আসেনি এবং একই সাথে প্যারা ৬ এ গিয়ে আদালত তাদের সন্দেহও প্রকাশ করেন যে সংবাদ পত্রের উপর সব সময় আস্থা রাখাও কঠিন।
প্যারা ৬-এ আদালত এটাও বলেন যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব সময় আগে থেকেই লেখা বা প্রিপেয়ার্ড বক্তব্য প্রদান করেন কিন্তু অফ-দা রেকর্ডে কিছু বললে সেটার রেকর্ড রাখা হয়না। এমন একটা ডিস্পিউট এই মামলায় জন্ম নেয়।
পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-ই ১৫/০২/১৯৯৯ ইং তারিখে তাঁর নিজ স্বাক্ষরকৃত স্টেটমেন্টে পরিষ্কারভাবে বলেন-
'২৯ শে জানুয়ারী সাংবাদিক সম্মেলনে ভারত সফর সম্পর্কে বক্তব্য রাখার পর সাংবাদিকগন আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন যার উত্তর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিভিন্নভাবে পরিবেশন করা হয়েছে।
প্রশ্ন উত্তরের এক পর্যায়ে দূর্নীতি মোকদ্দমা বিচারে বিলম্ব হওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে আমি বলি যে, আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করছে, সেখানে সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারেনা।
ইতিপূর্বে খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছিলো যে হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চে দুইদিনে ১২০০ জামিন দেওয়া হয়। এই বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন ধরনের সংবাদ/মন্তব্য আমার নজরে আসে।
সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, জাতীয় সংসদের আইন,বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের স্থায়ী কমিটিতে এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা জাতীয় সংসদের গণসংযোগ শাখা সঠিক নয় বলে প্রকাশ করেছে।
একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় এমনও মন্তব্য করা হয়েছে- 'When the hate campaign was building, the Law Minister and the Attorney General met the helpless Chief Justice almost daily, reportedly trying to influence the latter' (weekly Holiday of 6-11-1998, page 1, caption: "Supreme Court Under clouds" by Akbar Imam).
মাস তিনেক আগে খবরের কাগজে আগাম জামিনের শুনানীর ব্যাপারে হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চে এক অপ্রীতিকর ঘটনার বিবরণ দেয়া হয়। সেখানের একজন সিনিয়ার এডভোকেট বলেন যে, ঐ বেঞ্চে তার মক্কেলগন সুবিচার পাবেন না।
এ সকলের প্রেক্ষিতে যখন সাংবাদিক সম্মেলনে মোকদ্দমা বিচার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয় তখন খবরের কাগজে প্রকাশিত, উপরোক্ত সংখ্যার উল্লেখ করে, আমার যতটুকু মনে পড়ে,আমি বলেছিলাম যে, ঐ ঘটনা প্রধান বিচারপতিকে জানানো হলে তিনি বেঞ্চ পরিবর্তন করে দেন আর কোন ব্যবস্থা নেননি, ব্যবস্থা নিলে জুডিশিয়ারী অনেক দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতো এবং জুডিশিয়ারী সম্পর্কে মানুষের মনে কোন সন্দেহ দেখা দিতো না। দেশে আইন-শৃংখলা ও সেই প্রসঙ্গে প্রকাশিত সংবাদ/মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আমি এ অভিমত প্রকাশ করেছিলাম।
এ অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে বিচারকদের সততা সম্পর্কে কোন সন্দেহ প্রকাশ করিনি বা এই অভিমত প্রকাশ করার পেছনে আদালতের বা প্রধান বিচারপতির মর্যাদা ক্ষুন্ন করার বা বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করার কোন অভিপ্রায় আমার ছিলোনা'
এই ছিলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিজের সাক্ষরিত বক্তব্য যা আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে পরিষ্কারভাবে তিনি জানিয়েছেন যে আদালতকে কোনোভাবেই অবমাননা করবার তাঁর উদ্দেশ্য ছিলোনা এবং সেটা তিনি করেনও নি।
আদালত এই পুরো ঘটনার প্রেক্ষিতে একটা নিজস্ব অবজার্ভেশন টানেন যেখানে ৮ নাম্বার প্যারাগ্রাফে পরিষ্কার করে বলা হয় দেশের প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত জামিনের ব্যাপারে তিনি অবশ্যই তার মতামত দিতে পারেন এবং সেই এখতিয়ার তাঁর আছে কিন্তু সংবাদ পত্রের সোর্সে তথ্য জেনে সেটি নিয়ে সঠিক ফিগার উল্লেখ না করে মন্তব্য করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর আরো সতর্ক হওয়া দরকার বলে আদালত জানান।
রায়ের ৯ নাম্বার প্যারাতে আদালত আবারো একই কথা বলেন যে- there is nothing wrong on the part of the Executive to bring any matter, to the notice of the chief justice regarding a Court's performance and grievance, if any, entertained by it
রায়ের ১২ নাম্বার প্যারাগ্রাফে বলা হয় যে যেহেতু প্রধান বিচারপতির ইস্যুটি এখানে চলে এসেছে ফলে তিনি খুবই বিব্রত বোধ করেছেন ব্যাপারটি নিয়ে এবং তাঁর পক্ষে এই বিষয়ে আসলে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে বলাও সম্ভব হয় না।
এই কথা বলবার পর পর-ই আদালত বলেন যে, যে বিষয়টি সামনে এসেছে সেটা আদালত অবমাননা কিনা এই প্রশ্নে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা বেছে নিচ্ছেন ডিস্ক্রেশনকে। অর্থাৎ আদালত অবমাননা হয়নাই বলেই উনারা মতামত দেন। আর এই মতামত দিতে গিয়ে আদালত এই রকম বিষয়ের উপর একটা বিখ্যাত মামলার উদাহরণ টানেন।
কি সেই মামলা?
সেই মামলা হচ্ছে Andre Paul vs Attorney General, AIR 1936 PC 141]
এই মামলাতে লর্ড এটকিন নামের একজন বিচারপতির কথাকে এখানে কৌট করে বলা হয় এমন-
'......The path of criticism is a public way : the wrongheaded are permitted to err therein : provided that members of the public abstain from imputing improper motives to those taking part in the administration of justice, and are genuinely exercising a right of criticism and not acting in malice or attempting to impair the administration of justice, they are immune. Justice is not a cloistered virtue : she must be allowed to suffer the scrutiny and respectful even though outspoken comments of ordinary men'
লর্ড এটিকেনের সেই কৌট করা অংশের মধ্যে wrongheaded শব্দটা থাকার কারনেই আমাদের বীর বাঙালির জামাত-বি এন পি মূর্খ ও অশিক্ষিতদের মত ধরেই নিয়েছে এই শব্দটা প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়েছে।
কত বড় গন্ড মূর্খ, ভাবা যায়?
এই উপরের প্যারাতে কৌট করা ইংরেজী অংশটুকুর সহজ মানে হচ্ছেঃ
(ভাবানুবাদ) সমালোচনা করাটা একটা প্রকাশ্য উপায় কিংবা উন্মুক্ত অধিকার জাতীয় ব্যাপার। এটি সঠিক বিবেচনা প্রসুত/ ভুল বিবেচনা/ উৎকৃষ্ঠ বিবেচনা নয় এমন (wrongheaded) হতেই পারে। কিন্তু কথা থাকে যে সেই সমালোচনা যেন বিচার বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য/ উদ্দেশ্যে বিদ্বেষ প্রসুত না হয়। বিচার ব্যবস্থা কোনো নিবিড়/এবসোলিউট/ গুন নয়। এই ব্যবস্থাও সমালোচনার মুখে পড়বে, সুক্ষ ভাবে বিবেচ্য হবে এবং সেটা একজন সাধারণ মানুষও করতে পারে।
সোজা বাংলায় যে কথার মানে দাঁঁড়ায় বিচার ব্যবস্থা নিয়ে ভুল বিবেচনা প্রসূত কথা বার্তা হতে পারে কিন্তু সেইটা বিদ্বেষ মনোভাবের না হলেই হয়। আর বিচার ব্যাবস্থা কোনো সমালোচনার উর্ধ্বের কিছু নয়।
তো, এই রায়ে বিচারপতিরা wrongheaded শব্দটা একটা কৌট-এর অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, এটা দেখেই জামাত ও বিলুপ্ত বি এন পি'র কর্মীরা আগ-পাশ-তলা-উপর-নীচ কোনো কিছু না বুঝেই করলো কি, প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে ফেললো এবং চাউর করে দিলো যে শেখ হাসিনাকে রঙ হেডেড বলেছে আদালত।
কোন লেভেলের অশিক্ষা-কুশিক্ষা নিয়ে এরা এই সমাজেই ঘোরে ফেরে, ভাবা যায়?
যেখানে রঙ হেডেড শব্দটার মানেই হচ্ছে মিসগাইডেড/ভূল বিবেচনা প্রসুত আবার যেখানে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে লর্ড এইটকিনের একটা মামলার অংশ হিসেবে যে বিচার ব্যবস্থাকে আসলে সমালোচনা করা যাবে কিন্তু কিভাবে সেটা বুঝাতে গিয়ে, আমাদের বঙ্গ মূর্খরা সেটিকে অনুবাদ করলো পুরোপুরি রাজনৈতিক কায়দায়।
রায়ের মধ্যে রঙ হেডেড লেখা আছে তাইলে এইটা শেখ হাসিনাকে বলেছে এইটাই হোলো এক অশিক্ষিত বিরোধী দলের অশিক্ষিত প্রোপাগান্ডা। একবারো বুঝতে চাইলোনা রায়ে আসলে কি বলেছে কিংবা কাকে বলেছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ খারিজ হয়ে যায় উপরের অবজার্ভেশন দিয়ে।
এই হচ্ছে এত বছর ধরে চলে আসা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অশিক্ষিত এক বিরোধী দলের (বর্তমানে বিলুপ্ত) প্রোপাগান্ডা।
পড়া নাই, লেখা নাই, গবেষনা নাই। সারাদিন হই হই হই হই। 'রায়ে লিখসে রঙ হেডেড তাইলে ছড়ায়া দে', 'রায়ে লিখসে রঙ হেডেড তাইলে এইটা শেখ হাসিনার গায়ে লাগা দে', এই হচ্ছে আমাদের দেশের বিরোধী দলের কার্যত শোচনীয় অবস্থা।
এই রঙ-হেডেড ক্যাঁচালটা এই মূর্খরা কখন সামনে নিয়ে আসে, আপনি কি তা জানেন? ঠিক তখুনি আনে যখন দেশের বিভিন্ন মামলার রায় এনে আমরা দেখাই যে জিয়া একটা খুনী, খালেদাকে আদালত রাজাকারের পালনকারী বলেছে ইত্যাদি।
মানে দাঁড়াচ্ছে, আদালতের এইসব স্পস্ট বক্তব্য সামনে আনার পর তাঁরা শেখ হাসিনাকেও আদালত কিছু বলেছে এটা বলে একটা ডিফেন্স নিতে চায়। মানে তোমরা আমাদের লিডারদের চোর বলো, তাই আমরাও একটা ভুয়া রায় নিয়ে এসে তোমাদের চোর বলবো। এই হইলো কাহিনি।
আশা করি এই লেখাটা ভবিষ্যতের জন্য রেফারেন্স হয়ে থাকবে। আমি একই সাথে এটা নিয়ে একটা ভিডিও ব্লগও বানাবো যাতে আজীবন যে কেউ রেফারেন্স হিসেবে সেই ভিডিও-ও দিতে পারেন মিথ্যুক ও প্রোপাগান্ডায় জড়িত ব্যক্তিদের মুখের উপর।

Tuesday 14 August 2018

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারঃ ইতিহাস, আইন, সাক্ষ্য ও পর্যালোচনা



বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার নথি-পত্র, জেরা-জবানবন্দী, মামলার কার্যক্রম এগুলো খুবই ঠান্ডা মাথায় মন দিয়ে পড়বার পর একজন সুস্থ মানুষ অল্প কিছুক্ষণের জন্য হলেও মুষড়ে পড়বে এই কথাটা আমি খুব নিশ্চিত করে বলতে পারি।

আপনি এই মামলার জেরা ও জবানবন্দী জানবার পরে যে ক্রোধে আচ্ছাদিত হবেন এবং যে ব্যাথায় আপনি নিমজ্জিত হবেন সেটি কোনো ভাষা দিয়ে বর্ণনা করা অসম্ভব। কতটা নিষ্ঠুর ও নৃশংস উপায়ে তাঁরা জাতির জনক সহ তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করেছে, সেটি আমি কোনোদিন লিখে প্রকাশ করতে পারব কিনা, আমি জানিনা। কিন্তু বাংলাদেশ একটা সভ্য জাতির মত পরম ধৈর্য্য নিয়ে এই সুনির্দিষ্ট বিচারকাজ চালিয়ে গেছে।

আমার ইতিহাস পাঠ অভিজ্ঞতা জানায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্ন উঠেছিলো তখন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল এইসব অপরাধীদের বিচারের পরিবর্তে গুলি করে মারার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু মিত্র বাহিনীর অন্যান্য দেশের বিরোধিতার সেটি আর সম্ভব হয়নি।

এই মামলা পরিচালনা করবার একবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম গুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই ভয়ানক খুনীদের কি পরিমান সুযোগ ও সুবিধা দেয়া হয়েছিলো বিচারিক কার্যক্রমে। তাদেরকে ডিভিশন সুবিধা প্রদান থেকে শুরু করে কি সুবিধা ছিলোনা, যেটি দেয়া হয়নি?

আপনারা সকলেই জেনে থাকবেন যে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার যাতে না হতে পারে সে জন্য খুনী মোশতাক একটি অধ্যাদেশ জারি করে ১৯৭৫ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর। এই অধ্যাদেশকেই কুখ্যাত "ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ" বলে। যেই অধ্যাদেশের মাধ্যমে পরিষ্কার ভাবে বলে দেয়া হয় যে, খুনীদের বিরুদ্ধে কোন রকমের আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা যাবে না।


আসুন দেখে নেই কি লেখা ছিলো সেই অধ্যাদেশে-

Sunday 5 August 2018

সেই রাতে সৈন্যটি কি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিলো?

ওই রাতের সর্বশেষ হত্যাকান্ডের শিকার তিনি। মা'র কাছে যেতে চাইতেই এক সৈন্য তাঁকে মা'র কাছে পৌঁছে দেবে, এই কথা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো দোতলায়। যাবার আগে মহিতুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ভাইয়া আমাকে মারবে না তো?"

যাবার পথে রাসেল বাবার রক্তমাখা দেহের উপর দিয়ে হেঁটে গেছে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে। হয়ত বাবার দেহ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলো শিশুটি। যে বাবার এত প্রিয় ছিলো, তাঁর রক্তাক্ত দেহ দেখে কি রাসেল যেতে চেয়েছিলো আর?

তিনি কি বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁর নরম তুলতুলে পবিত্র হাতে? বাবাকে একবার ছুঁয়ে কি দেখেছিলেন তিনি? একটিবার কি বাবার মৃত দেহের উপর আছড়ে পড়েছিলো রাসেল? বাবাকে কি শেষবারের মত চুমু খেয়েছিলো আমাদের রাসেল? ঠিক মানুষের মত দেখতে সৈন্যগুলো কি সে সুযোগ দিয়েছিলো রাসেলকে?

Thursday 1 March 2018

যুক্তির মাইক্রোস্কোপের নীচে ইয়েন ইয়েনের জবানবন্দীঃ কতটা সত্য বলেছেন?

ঘটনাস্থল-রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের ওরাছরি গ্রাম। ছবিঃ পিনাকী দেব অপু

কেন লিখছি এই লেখা?

গত ২১ শে জানুয়ারী ২০১৮ দিবাগত রাত অর্থ্যাৎ ২২ শে জানুয়ারী ভোরে রাঙ্গামাটি জেলার, বিলাইছড়ি উপজেলার, ৩নং ফারুয়া ইউনিয়নের ওরাছড়া গ্রামে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যে কর্তৃক একজন নারীকে ধর্ষন এবং অন্য নারীকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়। এই অভিযোগের পর ঘটনা বহুদূর গড়িয়েছে এবং ব্যাপারটিকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যে রাজনীতি শুরু হয়েছে তা বিষ্ময়কর। 

স্বঘোষিত তথাকথিত রাণী ইয়েন ইয়েন এই পুরো ঘটনার রেশ ধরে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী তার ফেসবুকে একটি জবানবন্দী পোস্ট করেন। যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে সেই দুই নারীকে তিনি তার দলবলসহ দেখতে যাবার পর তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা হাসপাতালের মধ্যেই অন্তরীন করে রেখেছিলো এবং তিনি সেনাবাহিনীর এইসব বাঁধা অতিক্রম করে দেয়াল টপকে পালিয়েছিলেন, ১৫ মিনিট বন ও জঙ্গল দিয়ে দৌড়েছিলেন এবং পরে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আধাঘন্টা জলহস্তীর মত পানিতে মটকা মেরে পড়েছিলেন। তার পর তিনি লোকালয়ে ফিরে এসেছিলেন।

এই লেখাতে এই জবানবন্দীর পোস্টমর্টেম করা হবে। আমি দেখতে চেয়েছি যুক্তির মাইক্রোস্কোপের নীচে ইয়েনের জবানবন্দী আসলে কতটা সত্য। আমি একজন আইনজীবির চোখেই নয় বরং একজন সাধারণ মানুষের চোখেই আজ ইয়েন ইয়েনের বক্তব্যগুলোকে দেখবার চেষ্টা করব। আমি যেসব যুক্তি, যেসব ভ্যান্টেজ পয়েন্ট দিয়ে কথা বলব কিংবা যে অপিনিয়ন দেব সেটি একান্তই আমার। আপনারা পাঠকেরা বিবেচনা করবেন আমার বক্তব্যের জোর কিংবা কতটুকু যৌক্তিক। সে ভার আপনাদের কাছেই অর্পিত রইলো।

কিন্তু এগুলো সব জানবার আগে আসলে ঘটনার ইতিবৃত্ত-ও কিছুটা জেনে নেওয়া জরুরী।

আসুন শুরু করা যাক...

Monday 26 February 2018

সুপ্রিয় লাল কমরেড একটু পাছাটা উঁচু করুন, একটা সজোরে লাথি দিতে চাই

পাহাড়ের এক যুবক আমাকে গত পরশু খুব রেগে মেগে পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন-১৯০০ ইনবক্সে পাঠান। যেখানে তিনি আমাকে প্রচন্ড তীব্র ভাষায় বলেন, পারলে পড়ে দেখবেন। আমরা এই আইনে চলি, আপনাদের মতো না।

আজ সকালে রেগুলেশনটিতে চোখ বুলাচ্ছিলাম। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। মন খারাপ হোলো দুটো কারনে।

(১) এই বাংলাদেশের বুকে কত নীরব অন্যায় অজানা রয়ে গেলো
(২) মানুষ কিভাবে দাসত্বকে এইভাবে মেনে নেয়

আপনি নিশ্চই ভাবছেন উপরের কথাগুলো আমি কেন লিখেছি? আসুন একটু জেনে নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০ এর ৪২(ক)(১) থেকে শুরু করে ১৭ ধারা পর্যন্ত যে কথাগুলো লেখা রয়েছে সেটিকে পরিষ্কার বাংলা ভাষায় "দাসত্ব" বলা যেতে পারে।

সেখানে লেখা রয়েছে-

Sunday 25 February 2018

হে পাহাড় তুমি বিকশিত হও... বিনাশ কর সামন্ত প্রভুকে


একাত্তরের ঘাতক-রাজাকার পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বঘোষিত রাজা ত্রিদিব রায় ২০০৩ সালে একটি বই প্রকাশ করে। বইয়ের নাম "দি ডিপার্টেড মেলোডি" -[The Departed Melody, Memoirs, PPA Publications]। অনলাইনে অর্ডার করেছিলাম। গতকালই হাতে পেয়ে পড়া শুরু করেছি।

বইয়ের বিভিন্ন অংশ থেকে অল্প-বিস্তর উঁকি-ঝুঁকি দিতেই এক পৃষ্ঠায় দেখা গেলো এই ঘাতক আরেক ভয়ানক ঘাতক ফজলুল কাদের চৌধুরীকে বেশ প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। তাকে "টাইগার" বলে অভিহিত করছে।

ফজলুল কাদের চৌধুরী কে, তা নিশ্চই সকলেই জানেন। একাত্তরের নৃশংস ঘাতক সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা। "রতনে রতনে চিনে, শুয়োর চিনবে ঘেচু"। সুতরাং ত্রিদিব ফকা'র প্রশংসা করবে এতে অবাক হবার কিছু নেই।

কিন্তু বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে অন্য যায়গায়।

Saturday 24 February 2018

সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাচীন ন্যারেটিভঃ বাড়া ভাতে ছাই





[আমি লেখাটি উৎসর্গ করলাম আমার প্রিয় ভাই লেফটেন্যান্ট নিয়াজ হাসান আনন্দ-কে। বাবা-মা-পরিজন ছেড়ে যিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবার জন্য জীবনকে উৎসর্গ করবেন বলে মনস্থির করেছেন]

প্রথম ঘটনাটি বলছি। বহু বছর আগে লন্ডনে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটা আলোচনায় অংশ নেবার সৌভাগ্য হয়েছিলো। আমি খুব ভুল না করে থাকলে সালটা ২০০৯ অথবা ২০১০।

সেই আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী থেকে শুরু করে অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সকলেই বলা চলে সিভিল সোসাইটির অংশ। স্কুল শিক্ষক, অধ্যাপক, গবেষক ইত্যাদি গুনীজন।

আলোচনার একটা পর্যায়ে এক আপা (নাম বলছিনা) চট করে বলে বসলেন, (অনুলিখন) "নিঝুম আপনি জানেন না সেখানে বাংলাদেশ আর্মি মেয়েদের ধরে ধরে ধর্ষন করে, মাদকের ব্যবসা করে"

আমি খুব দ্রুত চারিদিকে তাকালাম। আমার সাথে থাকা **** ভাই ছাড়া আর বাকী সবাই খুব সম্ভবত এই অভিযোগে মাথা নাড়াচ্ছিলো। সবাই একমত। আমি আমার সকল বিষ্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, (অনুলিখন)

Wednesday 21 February 2018

পার্বত্য চট্রগ্রাম ও সাম্প্রতিক ভাবনা

গত প্রায় দু'তিনদিন ধরে আমার ভাবনার ও পড়বার বিষয়ে খুব তীব্র আকার নিয়ে যোগ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে দিনের পর দিন অভিযোগের তীর ক্রমাগত উঠেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দিকে।
পাহাড়ে পান থেকে চুন খসলে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যে রটনা, যে কুৎসা কিংবা যে সংবাদ্গুলো অন্তত পক্ষে আমার ফেসবুকের টাইমলাইনে ভেসে আসে, তা মোটেই সুখকর নয়।
আমার ফেসবুকে যেসব পলিটিকাল কর্মী ও মানবাধিকার কর্মীরা রয়েছেন এদের বেশীরভাগের বক্তব্য আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে নির্মোহ মনে করিনা। তাই তাদের বক্তব্য একেবাড়ে চূড়ান্ত বলে গ্রহন করতে পারিনি। এই না করবার পেছনে আমার নিজস্ব একটি অবস্থান ও যুক্তি রয়েছে। আমি আসছি এই ব্যাপারে।
গত প্রায় বেশ কিছুদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম দু'জন নারীকে ধর্ষন বিষয়ে আলোচনা তুঙ্গে। যথারীতি চোখ বন্ধ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দোষ দিয়ে দুই তিনবার মিডিয়া ট্রায়াল হয়ে গেছে। স্বাভাবিক ভাবেই এই বিষয় আমার আগ্রহের চূড়ান্ত জন্ম দিয়েছে।

Sunday 21 January 2018

Synopsis of my upcoming book: Misuse of The Muslim Identity during the Trials Of 71’ War Criminals





The Pakistan army and their various Bangladeshi collaborators conducted appalling acts of genocide during the Liberation War in 1971. They took the lives of 30 lac common Bangladeshis, maybe even more, whilst harassing and persecuting a further 4 lac women and children. Within this murderous scheme outlined and executed by the Pakistani army, there were other factors in play here namely a few political groups, individuals, organizations and forces which played at times either directly or indirectly assisted the Pakistani army in that murderous rampage of theirs.

Among those during the war, if we are looking to name some of the chief collaborators, we can talk about the Jamaat-E-Islami, Nizam-E-Islami, Pakistan Muslim League and Pakistan Democratic Party (PDP).

Wednesday 14 September 2016

Mir Quasem’s apologist Ghamdi and his sins

ali-al-ghamdi-300x193There have been quite a few conniving and morally denigrating articles that have been published against International Crimes Tribunal Bangladesh but perhaps the one penned by Saudi Arab’s Al-Ghamdi eclipses all of them. In this race to the bottom, Al-Ghamdi’s article not only lacked proper depth and perception, his use of the English words were appalling, rendering the article void of any structure or rigidity. The continuous usage of obscene words painted the picture of a man whose knowledge in International Criminal Law is next to zero.
So you may ask, why am I even bothering to write a rebuttal to Al Ghamdi’s article titled “For what sin did Bangladesh hang Mir Quasem Ali?”, which was published on the 7th of September inside the Saudi Gazette. Well firstly because I have a conscience. Secondly, being an active researcher on the International Crimes Tribunal Bangladesh, I am always on high alert if there are individuals or entities looking to instigate false propaganda or promote baseless arguments. And lastly it is my duty to admonish each and every one of these propagandas, no matter how small and pathetic the attempt might be.
According to the information provided at the bottom end of his article, Al Ghamdi is apparently a Saudi diplomat, a Ph.D degree holder, and a lecturer of a University. But sadly it seems Mr Ghamdi lacks the proper amount of tact and a filter for that matter, when it comes to writing articles about a free, sovereign nation and the highest echelon of its legal system.

Tuesday 6 September 2016

Bergman tries but fails to justify War Criminal SQC

On the 22nd of November, convicted war time criminal SQC was hanged till death, as per the instruction of the highest court of law existing in Bangladesh. There were a few curious reactions to his predicament, but none more so than one provided by Mr David Bergman, rookie journalist for the New Age newspaper published in Bangladesh. He chose to react by publishing an article on his blog, which he constructed listing 10 separate concerns, detailing as to why SQC’s trial may have been an unfair and biased one.
At the start of his tireless monologue, Mr Bergman chose to begin divert the reader’s attention towards SQC’s previous political exploits. It was done so in a manner which we adjudged to be biased at best and convincing to say the least. We can rightly refer to the court’s comment regarding Mr Bergman’s “Psyche state” by pinpointing his intentions in the lawsuit where he was accused of contempt of court. The ICTBD-2 went on saying-
68. Contemnor’s intention was to demean the authority and ability of the Tribunal and to generate controversy and confusion on historically settled issue in the mind of public, we conclude.
ICTBD also confirmed in another similar lawsuit brought against Mr. Bergman in 2011 where the court confidently stated that-

Sunday 4 September 2016

রাজাকার মীর কাশেমকে নিয়ে টিপু ভাইয়ের বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন এবং আমার উত্তর

যুক্তরাজ্য প্রবাসী বড় ভাই মোহাম্মদ হামিদ টিপু আইনী জগতের একজন বিজ্ঞ লোক। সাম্প্রতিক সময়ে মীর কাশেমের ফাঁসী ও তার কার্যকর নিয়ে তিনি তাঁর ফেসবুকে সরকারের ও আদালতকে তীব্র সমালোচনা করছেন। তিনি এই বিচারকে প্রহসন ও “মিসক্যারেজ অফ জাস্টিজ” বলে অভিহিত করেছেন।
টিপু ভাই তাদেরও অত্যন্ত তীব্র ভাষায় ভৎসনা করেছেন যারা এই কাশেমের ফাঁসীতে অত্যন্ত উদ্বেলিত ও আনন্দিত। তিন ই এসব আনন্দকে কুৎসিত, বর্বর, রক্ত পিপাসু ও একটি পর্যায়ে ফেরাউনের সাথেও তুলনা দিয়েছেন।

ব্যক্তি তাঁর মত প্রকাশ করবেন। আমি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমি এও মনে করি যে কোনো ব্যাক্তির মতামত পছন্দ না হলে আইদার সেটিকে আমি এড়িয়ে যেতে পারি বা সেই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে পাল্টা বক্তব্য দিতে পারি।

টিপু ভাইয়ের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমি পাল্টা বক্তব্য দেয়াকে বেছে নিয়েছি। তিনি আমার একটি পোস্টে মীর কাশেমের মামলা নিয়ে কয়েকটি মন্তব্য করেছেন। এই মন্তব্যের সূত্র ধরেই আমার এই লেখাটির সূচনা। লেখাটি আরো দীর্ঘ ও গভীর হবার দাবী রাখে। কিন্তু এটি যেহেতু কয়েকটি মন্তব্যের উত্তর তাই ঠিক সেভাবে গভীর ভাবে লিখিনি। ঠিক উত্তরের জন্য যতদূর প্রয়োজন ঠিক ততটুকু লিখেছি। কাশেমের ব্যাপারে একটি দীর্ঘ পর্যবেক্ষন আমার প্রকাশিতব্য গ্রন্থ “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালঃ আইন, বিচার, বিশ্লেষন ও পর্যবেক্ষন”-এ থাকবে যেটি আগামী বই মেলায় বাজারে আসবে বলেই আশা করি।

Thursday 24 March 2016

বিচার হতে কেন ৩৯ বছর গড়ালো? অনুসন্ধান পর্ব-১





আমি মুক্তিযুদ্ধের দশকের ঠিক শেষে জন্ম নেয়া একজন যুবক। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা আমাকে সরাসরি না ছুঁয়ে গেলেও আমি সেটি অনুভব করতে পারি পারিবারিক নানা ঘটনার কারনেই। বাবার মুখ থেকে শোনা ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের উপর বই-পত্র, দলিল-দস্তাবেজ পাঠ সহ এই ব্যাপারে যৎসামান্য আমার যা পড়াশোনা আছে আমি সেই আলোকেই মূলত মুক্তিযুদ্ধকে নিজের ভেতর আত্নস্থ করেছি কিংবা করবার চেষ্টা করেছি ও করছি। একজন আইনের ভুবনের সামান্য মানুষ ও আইনের ছাত্র হিসেবে আমি বরাবর আগ্রহী ছিলাম মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পর পর কেন রাজাকার-আলবদরদের বিচার শেষ পর্যন্ত আর হয়ে উঠেনি সেই ব্যাপারটি নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে আমি আমার এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি, আমি প্রশ্ন করেছি, আমি অনুসন্ধান করেছি। অনেক কিছু জেনেছি আমি আবার অনেক কিছু আজও জানিনা।

ফেসবুকের একটি নোটের কলেবর দীর্ঘ করাটা অনুচিৎ। সে কারনেই হয়ত আমি খুব দীর্ঘ কিছু লিখতে পারব না এখানে অথবা এখানে হয়ত অতটা বিস্তারিত কিছুই লেখা যাবেনা কিন্তু তারপরেও আমি এই বিচারের শুরু নিয়ে আমার অনুসন্ধানের প্রথম পর্বের সূত্রপাত করতে চাই এই নোটের মাধ্যমে।[ মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই ঘাতক-দালালদের বিচারের পুরো বিষয় নিয়ে একটি সেমি- আইনী বই প্রকাশ করার চেষ্টা করছি। আশা করি সেই দীর্ঘ কলেবরের বইয়ে আরো বিস্তারিত থাকবে] আমার জ্ঞান যেহেতু বই-পত্র, সে সময়ের মানুষের অভিজ্ঞতার বর্ণন, স্মৃতিচারণ কেন্দ্রিক সুতরাং এই লেখাটা “একেবারে সঠিক” এটা বলা যাবেনা কোনোভাবেই। তথাপিও আমি আমার নিজস্ব অনুধাবনের উপর আস্থা রেখেই লিখছি। প্রাপ্ত তথ্য আর উপাত্তকে সৎভাবেই বর্ণনা করবার চেষ্টা করেছি আমি।


যেহেতু বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালের ২৫ শে মার্চ তারিখ থেকে একাত্তরের ঘাতকদের বিচার শুরু করেছে সেহেতু আমি মূলত আলোচনা করব ২০১০ সালের আগের ৩৯ বছর নিয়ে। মূলত এই পর্বে সূচিত করবার চেষ্টাই থাকবে ১৯৭২ সালের দালাল আইন নিয়ে, দালাল আইনে বিচার শুরুর প্রাক্কালের ঘটনা এবং পরবর্তীতে নানাবিধ ঘটনা নিয়ে।

Tuesday 22 March 2016

একাত্তরের ঘাতকদের বিচারে মুসলিম আইডেনটিটির অপঃব্যবহার- পর্ব-৩




(খ) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বিচার ও সেখানে মুসলিম আইডেনটিটির অপঃ ব্যবহার

এই লেখাটির ১ম পর্ব পড়তে হলে ক্লিক করুন এখানে
এই লেখাটির ২য় পর্ব পড়তে হলে ক্লিক করুন এখানে

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত বর্বর গণহত্যার সাথে বাংলাদেশের যে সকল দালাল তথা রাজাকার,আল-বদর, আল-শামস এবং ইন্ডিভিজুয়াল যেসব ব্যাক্তি এই গণহত্যা এবং সেসময়ে এই যুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলো, তাদের বিচার বাংলাদেশ সরকার একটি নিরপেক্ষ ট্রাইবুনাল এর মাধ্যমে অত্যন্ত সুচারু ও সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি মুক্ত রেখে শুরু করেছে। ২০১০ সালের ২৫ শে মার্চ একটি গেজেট নোটিফিকেশানের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে ট্রাইবুনাল এবং ২৬ শে জুলাই ২০১০ সালে শুরু ট্রাইবুনালের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। এই ট্রাইবুনাল যেই আইনে পরিচালিত হচ্ছে, সেই আইনের নাম হচ্ছে- আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন-১৯৭৩। গত ২৫ শে মার্চ ২০১৬ সালে এই ট্রাইবুনালের বয়স গিয়ে দাঁড়ালো ৬ বছর।

এই বিচারটি শুরু হয়েছে ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকারের নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতি হিসেবেই। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে এই রকমের যে একটি বিচার করবার জন্য একটি সরকারকে যেমন নিবেদিত প্রাণ, দক্ষ হতে হয় তার শতকরা ত্রিশ ভাগও এই সরকার দেখাতে পারেনি। 

এই আইন সম্পর্কে কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের সম্পর্কে (সাবেক) আইনপ্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, এক সময়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মইনুদ্দিন খান আলমগীর, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, মতিয়া চৌধুরীকে নানান যায়গায় যেসব কথা বার্তা, বিবৃতি দিতে দেখেছি যেগুলো একটা পর্যায়ে বিচারিক ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরী করেছে। এমনকি সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও মতিয়া চৌধুরী ট্রাইবুনাল বিষয়ক নানান বক্তব্যের জন্য ট্রাইবুনালের কাছে ক্ষমাও প্রার্থনা করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হোসেন আপীলেট ডিভিশানের বিচারপতিদের নিয়ে যেই মন্তব্য করেছেন এই বিচার বিষয়ক কিছু ইস্যুওকে কেন্দ্র করে সেটির জন্য দু’জনেরই ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা হয়েছে এবং তাঁদের মন্ত্রীত্ব এখন প্রায় যায় যায় অবস্থায় রয়েছে।

উপরে যে বলেছি দক্ষতার কথা কিংবা নিবেদিত প্রাণের কথা সেটি বলছি এই ট্রাইবুনালকে নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের ব্যাপক আকারে মিথ্যাচার ও তার প্রেক্ষিতে সেটি ঠেকাতে সরকারের ব্যার্থতার পুরো ব্যাপারটি মাথায় রেখেই। মুক্তিযুদ্ধের পর যেখানে জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ কিংবা বেগম খালেদা জিয়ার আমলে মুক্তিযুদ্ধকালীন দালাল ও রাজাকার রা পুনর্বাসিত হয়েছে ও সেইসাথে মন্ত্রীত্ব পেয়েছে, জাতীয় সংসদে গিয়েছে সেখানে এটা আওয়ামীলীগ সরকারের সহজেই অনুমান করা উচিৎ ছিলো যে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৩৯ বছর পর এই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যথেষ্ঠ সংঘবদ্ধ হয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে প্রকট আকার ধারন করেছে। 

Monday 21 March 2016

একাত্তরের ঘাতকদের বিচারে মুসলিম আইডেনটিটির অপঃব্যবহার- পর্ব-২

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দুই সময়ের বিচার পর্ব এবং সেখানে মুসলিম আইডেনটিটির ব্যবহার


এই লেখাটির ১ম পর্ব পড়তে হলে ক্লিক করুন এখানে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একদিকে যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের অনুসারীদের বক্তব্য ও চিন্তা করবার ভিন্নতা রয়েছে তেমনি সেটির সূত্র ধরে ঐতিহাসিক বিষয়াদির গুরুত্বও অনস্বীকার্য। এই অঞ্চলে ধর্মকে কতটা গুরুত্বপূর্ন করে দেখা হয়, এটার রাজনৈতিক অবস্থান, মেরুকরন ও রাজনৈতিক তারতম্যের কারনে ধর্মের অবস্থান ও জনতার ভাবনা প্রতিটি বিষয়-ই আসলে আলোচিত হওয়া একান্ত জরুরী। উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে হয়ত একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে অখন্ড পাকিস্তানে ধর্ম ব্যাপারটি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও ধর্মের প্রতি আনুগত্য, মানবার প্যাটার্ন, ধর্ম পালন করবার রীতির মধ্যে ফারাক ছিলো দুই খন্ডের পাকিস্তান ভেদে। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান ঘোষনা দিয়ে হয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র আর পূর্ব পাকিস্তান মানে বাংলাদেশ হয়েছে অসাম্প্রদায়িক মোনোভাবাপন্ন একটি রাষ্ট্র যেই রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির একটি নীতি-ই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। 

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মকে সমীহ ও ধর্মকে যথাযথ পবিত্রতার মাধ্যমে পালন করলেও অধিকাংশ মানুষ ধর্ম নিয়ে কখনোই বাড়াবাড়ি করেনি কখনো। আর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশ যুদ্ধ করেছে সকল ধর্মের মানুষ একত্রিত হয়েই। উল্লেখিত সেই সহযোগী বাহিনী, ব্যাক্তি ও তাদের অনুসারীরা ছাড়া আর কেউই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ধর্মকে কখনোই এই যুদ্ধের প্রধান বিষয় বলে মনে করেনি কিংবা কখনোই মনে করেনি এই যুদ্ধ ভারতের চাল বা ছল, এমনকি এই যুদ্ধে বাংলাদেশ আলাদ রাষ্ট্র হলে ইসলাম বিপন্ন হবে কিংবা পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলে ইসলাম শেষ হয়ে যাবে এমন কথাও সাধারণ মানুষ চিন্তা করেনি।

Sunday 20 March 2016

একাত্তরের ঘাতকদের বিচারে মুসলিম আইডেনটিটির অপঃব্যবহার- পর্ব-১

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী নানাবিধ বাহিনী। খুন করে ৩০ লক্ষ কিংবা তারও অধিক সাধারণ বাংলাদেশীকে এবং লাঞ্ছিত ও নির্যাতন করে প্রায় ৪ লক্ষ কিংবা তারো বেশী নারী ও শিশুকে। পাকিস্তানী বাহিনীর যে হত্যাযজ্ঞের ব্যাপকতা ও পুরো ছক, সেই সমগ্র ছকের আওতায় সে সময় বাংলাদেশেরই কিছু রাজনৈতিক দল, ব্যাক্তি, গোষ্ঠী এই বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে সে সময় এই গণহত্যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সহযোগিতা করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যদি প্রধান সহযোগী হিসেবে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নাম বলা যায় তবে বলা যেতে পারে জামায়াতে ইসলামী, নেজাম-ই-ইসলামী, পাকিস্তান মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)এর কথা। 

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে এই রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা, কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাংখীরা মিলে এই বাংলাদেশেই মুক্তিযুদ্ধের সময় গড়ে তোলে নানা প্রকারের বেসামরিক, আধা সামরিক, ডেথস্কোয়াড সহ আরো নানাবিধ বাহিনী। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে এই সমন্বিত দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের একাত্নীকরণের উদ্দেশ্য ছিলো একটাই আর সেটি হচ্ছে স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ বাংলাদেশীদের হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে এই বাংলাদেশ ভূ-খন্ডে পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্ব বজায় রাখা।

একটা বিশেষ লক্ষ্যনীয় ব্যাপার এই ক্ষেত্রে মনে রাখা খুব প্রয়োজনীয় যে মুক্তিযুদ্ধকালীন কিংবা তারও আগে এই পুরো পাকিস্তান রাষ্ট্র উৎপত্তি পূর্বক যে রাজনৈতিক, আদর্শিক কিংবা চিন্তার নানাবিধ প্যাটার্ন আমরা লক্ষ্য করেছিলাম সেখানে ধর্ম একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে উঠে এসেছে।

Saturday 12 March 2016

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গুরুত্বের বিকৃতি বিরোধী আইনঃ কেন চাই?

সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র ভাবে দাবী উঠেছে “জেনোসাইড ডিনায়াল আইন” এই শিরোনামে বাংলাদেশে আইন প্রণয়নের। মূল আলোচনায় যাবার আগে প্রথমেই এই আইন প্রণয়ন করবার দাবী আর সেটি যে শিরোনামে জন সাধারণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সেটির সাথে আমি বিনীত ভাবে দ্বিমত পোষন করি। 

জেনোসাইড শব্দটি বর্তমানে ইংরেজী লক্ষাধিক শব্দের একটি শব্দ হিসেবে বিবেচিত হলেও এটির ধারনা বলা যেতে পারে সাম্প্রতিক। ১৯৪৪ সালের আগে এই শব্দটির-ই ব্যবহার ছিলোনা। পোলিশ আইনজীবি রাফায়েল লেমকিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ হত্যাকান্ড আর নৃশংস তান্ডব দেখে এই সম্পূর্ণ হত্যাকান্ডকে “জেনোসাইড” শব্দের মাধ্যমে নাম করন করেন। গ্রীক এবং ল্যাটিন এই দুইটি ভাষার ভিন্ন ভিন্ন শব্দ নিয়ে জেনোসাইড এখন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বোধগম্য শব্দ। একটি সুনির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী, আদর্শের মানুষদের হত্যাকরার ঘটনাকেই এই একটি শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। লেমকিনের নিজের ভাষায়, 

“a coordinated strategy to destroy a group of people, a process that could be accomplished through total annihilation as well as strategies that eliminate key elements of the group's basic existence, including language, culture, and economic infrastructure.”

Saturday 30 January 2016

অমি রহমান পিয়াল প্রসঙ্গে আসিফ মহিউদ্দিনঃ আইনী ভাষ্য



ব্লগারদের হত্যাকান্ড শুরু হবার পর থেকেই বিশেষ করে জার্মানী, ইংল্যান্ড, সুইডেন এই তিনটি দেশে কয়েকজন সুনির্দিষ্ট ব্যাক্তি কিভাবে কিভাবে যেন এই ফেসবুকের মাধ্যমে চাউর করে বেড়াচ্ছে যে বাংলাদেশ থেকে আস্তিক-নাস্তিক-ব্লগার বিষয়ক কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করা হলেই এদের কাছ থেকে নাকি বিভিন্ন দেশের সরকারী প্রতিনিধিরা জিজ্ঞেস করে তবেই রাজনৈতিক আশ্রয় কিংবা এসাইলাম দেবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন।

ইংল্যান্ডে এই টাইপ একজনকে পেলেও জার্মানীতে অবস্থান করা আসিফ মহিউদ্দিনের মত এমন অভব্য, হামবড়া ও অযৌক্তিক ধরনের লেখা আর কাউকে আমি লিখতে দেখিনি। সাম্প্রতিক সময়ে বড় ভাই/বন্ধু রেজা ভাই আসিফ মহিউদ্দিন নামে এক ব্যাক্তির কিছু লেখার স্ক্রীনশর্ট আমার কাছে পাঠিয়ে জানতে চান যে আসিফ মহিউদ্দিনের এইসব কথা বার্তা আইনী দৃষ্টিতে কতটুকু সত্য মনে হয় কিংবা এইভাবে লেখাগুলো কি আদৌ ইউরোপে বিদ্যমান কোনো আইনের বরখেলাপ কি না? 

একজন আইনজীবির দেখবার দৃষ্টিকোন থেকে আমি আসিফ মহিউদ্দিন এর লেখাগুলো দেখেছি এবং এই ব্যাপারে আমার নিজস্ব কিছু মতামত দিচ্ছি।

Saturday 19 December 2015

অস্ট্রেলিয়া থেকে ব্যারিস্টার ও সলিসিটর হতে ইচ্ছুক যারা

ভূমিকাঃ

আমার পরিচিত কিংবা অপরিচিত বিভিন্ন রেফারেন্সের সূত্র ধরে অনেকেই প্রায়শঃ জানতে চান যে তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে কিভাবে ব্যারিস্টার ও সলিসিটর হতে পারবেন। এরকম অনেক কৌতূহলের প্রেক্ষিতেই মনে হোলো এই বিষয়ক একটি সাধারণ ধারনা যদি আমি পাঠকদের দিতে পারি তবে যারা অস্ট্রেলিয়া থেকে ব্যারিস্টার ও সলিসিটর হতে চান তাঁদের জন্য খুব সুবিধা হবে।

আগেই বলে নেয়া ভালো যে এই লেখাটি একেবারে খুব বিস্তারিত আলোচিত হচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়া থেকে ব্যারিস্টার এবং সলিসিটর হওয়া খুব দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। প্রচুর বিধি রয়েছে, নিয়ম রয়েছে, ফরমালিটিস রয়েছে। সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে এই কোর্স করতে হলে আপনাকে প্রচন্ড ধৈর্য্যশীল এবং পরিশ্রমী হতে হবে। পড়ালেখাতে সামান্য যদি গাফিলতি করেছেন তাহলে সেটির দায় পুরো কোর্স জুড়ে আপনাকেই বহন করতে হবে এবং এমনকি এই কোর্স থেকে আপনি ছিটকেও পড়তে পারেন।

অস্ট্রেলিয়ায় আইন প্র্যাক্টিস বেশ প্রতিযোগিতামূলক। প্রতিবছর-ই অনেক নবীন আইনজীবি কোর্স শেষ করে বের হচ্ছেন কিন্তু বাস্তব জীবনে কে কতটুকু ভালো করবেন সেটি আসলে নির্ভর করে ব্যক্তির আইন বুঝবার ক্ষমতা, কতটুকু পরিশ্রম করতে পারছেন, কোন সিনিয়রের সাথে সহকারী হিসেবে কাজ করছেন, কমিউনিকেশন দক্ষতা কেমন, ইংরেজীতে বলতে পারবার দক্ষতা কেমন কিংবা আইনের সুনির্দিষ্ট কোন অংশে কাজ করছেন বা করবেন এইরকম নানাবিধ সিদ্ধান্তের উপর।

Saturday 5 December 2015

এমন তো কথা ছিলো না...

রিচার্ড আর ক্রিস্টিনা সারা রাস্তা জুড়েই কথা বলছিলো স্কেট বোর্ডিং নিয়ে, ক্যানাল বোটিং নিয়ে, কবে কে কখন বাঙ্গি জাম্প দিয়েছে, স্কাই ডাইভ করেছে সেসব নিয়ে। আমিও সে আলোচনায় মাঝে মধ্যে ঢুকি, টুকটাক অন্য কিছু নিয়েও আমাদের কথা হয়, তারপরেও আমি কেন জানি আনন্দ পাইনা।আমি ওদের পেছনে পেছনে হাঁটি আর ওরা সামনে দু’জন কথা বলে জীবনের অসংখ্য আওনন্দের ঘটনা নিয়ে। কোন দেশের কোন খাওয়া ভালো, কোন রাস্তা ভালো, কোন শহর ভালো...আর কত কি...

কি এক শূন্য চাহনি নিয়ে বেইজিং এর ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি। এত ঘন বসতিপূর্ণ একটা দেশ অথচ কি চমৎকার করে সাজিয়ে রেখেছে। চায়না ছাড়া এই পৃথিবী মোটামুটি অচল আর আমি সেই চায়নাতে দাঁড়িয়ে আছি ভাবতেই আবার দ্রুত চারিদিকে তাকিয়ে নেই এক নজর। আর ঘন্টা দশেক পর এই শহর ছেড়ে পাড়ি দেব লন্ডনে, তাই শুধু যত দ্রুত দেখে নেয়া যায়...

Friday 4 December 2015

আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের থিওরেটিকাল কাঠামো ও বাংলাদেশের ট্রাইবুনালঃ আইনী পর্যবেক্ষণ

২০১০ সালের ২৫ শে মার্চ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সূচনা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী ও তাদের দোসরদের মাধ্যমে সংগঠিত নানাবিধ আন্তর্জাতিক অপরাধের সুষ্ঠু বিচারের লক্ষ্যেই এই ট্রাইবুনাল গঠিত হয়। ১৯৭২ সালের দালাল আইনের মাধ্যমে শুরু হওয়া বিচার যদিও সে সময়ে আশার আলো দেখিয়েছিলো কিন্তু ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে সেই বিচার বন্ধ করবার মধ্য দিয়ে এই বাংলাদেশ বিচারহীনতার দীর্ঘ ৩৯ বছর বিচারহীনতার এক কালো অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছে। এর ফলে বিচার প্রার্থী আর অপরাধীদের একই দেশে সহঅবস্থান নিশ্চিত হয়েছিলো এবং রাষ্ট্র তার জন্মের সূচনালগ্নেই বিচারপ্রার্থীদের উপর অন্যায়ের সূচনা করেছিলো এবং সেটি প্রকারন্তরে রাষ্ট্রের উপর অবিশ্বাস জন্মাবার সূচনা করে। কিন্তু ২০১০ সালে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল এই জন্মানো হতাশার মধ্যে এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে পুনঃর্জন্ম দান করেছে। বিচারহীনতার লজ্জার একটা সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পথে ছুটে চলেছে এর চাইতে এত বড় আনন্দের আর কিছু নেই সম্ভবত।

পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশের এই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার করবার পুরো প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রের সদিচ্ছা, প্রসিজিওর, বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে নির্মূল করবার পদক্ষেপ এসব সব কিছু মিলিয়েই এই ট্রাইবুনাল, এই আদালত, এই আইন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন নিয়ে যারা পড়েন, গবেষনা করেন, আগ্রহী তাঁদের সকলের জন্যই বাংলাদেশের এই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার সব সময়ের জন্য ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।

Wednesday 25 November 2015

রাজাকারদের প্রতি দরদ কেনো হলো বাংলাদেশে?

মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের শিউরে উঠা নৃশংশতা আর অভিজ্ঞতার পরেও সাকা আর মুজাহিদের মত দুইজন জলজ্যান্ত একাত্তরের ঘাতকদের পক্ষে এই বাংলাদেশে একজন হলেও যদি সহমর্মিতা দেখায় তবে ভাববার প্রয়োজন রয়েছে যে কেন সেটি হচ্ছে। সাময়িকভাবে আপনার হয়ত ক্ষোভ হতে পারে কিংবা ক্রোধে ক্রোধান্বিত হয়ে সেটি প্রকাশও করতে পারেন। সেটি করাই স্বাভাবিক কিন্তু কেন এটি হচ্ছে বা হোলো এগুলো নিয়ে কিছুটা হলেও গভীর ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। আমি হয়ত সেই গভীর ভাবনা কিংবা দূর্দান্ত এনালিটিকাল একটা লেখা লিখবার জন্য যোগ্য নই বা সে ক্ষমতাও রাখিনা কিন্তু সামান্য ভাবনার খোরাক আমি আমার পাঠক/পাঠিকাদের জন্য হয়ত যোগাতে পারি। এই ভাবনার খোরাক নিয়েই হয়ত তাঁরা আরো সুগভীরভাবে ভেবে দেখবেন পুরো ব্যাপারটি।
আমি আমার পূর্বের অনেক লেখাতেই ১৯৭২ সালে যখন সর্ব প্রথম দালাল আইনে রাজাকার-আলবদরদের বিচার হয়েছিলো সে বিচারের নানা প্রাসঙ্গিক কথন আপনাদের সামনে হাজির করেছিলাম। সে সময়কার বিচারটা ছিলো এমন একটা সময় যখন মুক্তিযুদ্ধের দগদগে স্মৃতি আর ভয়াবহতার কথা শরীরে আরো তাজা হয়ে লেগে ছিলো। তার মানে এই নয় যে এখন আর সেটি তাজা নয়, কিন্তু সময়ের ক্রম বিবেচনা করলেও সে সময়কার স্মৃতি অনেক বেশী কাছাকাছি ও নৃশংসতাকে আরো বেশী স্পস্ট করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পর পর এই দালাল আইনে বিচারের সময় জামাতী ইসলামী, নেজামী পার্টি, মুসলিম লীগ সহ যে যে দলের মধ্য থেকে রাজাকার, আলবদর তথা ঘাতকেরা মূলত উঠে এসেছিলো সেসব দল কিংবা দলের সদস্যরা দৌড়ের উপর ছিলো। মূলত সাড়ে সাত কোটি বাংলাদেশীদের মধ্যে অধিকাংশ বাংলাদেশী এই বিচারের পক্ষে ছিলো এবং এটাই সে সময় স্বাভাবিক ছিলো। স্বাভাবিকের থেকে সবচাইতে বড় ব্যাপার ছিলো যে কোনো অপরাধ রাষ্ট্রের ভূ-খন্ডে হলে এটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের উপরেই গিয়ে বর্তায় সে অপরাধের ন্যায্য বিচার করবার জন্য।

Monday 23 November 2015

দায়টা শুধু আওয়ামীলীগের উপরেই কেন বর্তালেন আপনারা?

এই বিচারের বিরুদ্ধে যে প্রোপাগান্ডা সবার আগে আমাদের শুনতে হয় সেটি হচ্ছে, এই বিচার আওয়ামীলীগ সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবার জন্যই করেছে। শুনতে শুনতে কান পঁচে গিয়েছে। কিন্তু যখনই আমি এই অসভ্য প্রচারণার বিরুদ্ধে যৌক্তিক কিছু প্রশ্ন করি তখন শুনতে হয় “শালা আওয়ামীলীগের দালাল” বাক্যটি।
ব্যাক্তিগত ট্যাগিং-এ আমি কখনো আওয়াজ দেই না। ট্যাগিং হচ্ছে আক্রমণের অস্ত্র। যে যুদ্ধে আছি সেখানে এইসব অস্ত্রের আঘাত সইতে হবে এটা জেনে আর বুঝেই মাঠে নেমেছি। সুতরাং ট্যাগবাজেরা ব্যার্থ হবেই, এতে আমার সন্দেহ নেই। কিন্তু যে বিষয় নিয়ে আমি এই লেখাটি শুরু করেছি সেটিতেই বরং ফিরে যাই। এই বিচারটা যখন শুরু হোলো তখন এই বিচারবিরোধীরা আর কিছু বিভ্রান্ত মানুষেরা ঠোঁট উল্টে বলা শুরু করলো আরেহ... আওয়ামীলীগ ১৯৯৬ সালে জামাতের সাথে জোট করে এখন আবার ২০১০ সালের বিচার করে, ভাওতাবাজির আর যায়গা পায়না। এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগটি দেবার আগে আমাদের কিছু কথা জেনে রাখা খুব বেশী মাত্রায় প্রয়োজন।

Thursday 29 October 2015

সাকা'র পাকি বন্ধুদের এফিডেভিটঃ একটি ভয়াবহ অসংগতির প্রমাণ

এরই মধ্যে যারা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে নিয়ে আমার নিজের ব্লগে কিংবা ফেসবুকে নানাবিধ লেখা দেখেছেন তারা হয়ত জানেন যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলাটি নিয়ে আমি নানাবিধ আঙ্গিকে লেখা লিখেছি এবং আপনাদের নানাবিধ তথ্য দেবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজকে আমার চোখে এক মারাত্নক ব্যাপার ধরা পড়লো। এই তথ্যটি এসেছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে সাফাই সাক্ষী দিতে চাওয়া ৫ জন পাকিস্তানীর মধ্যে দুইজনের এফিডেভিট আরো একবার ভালো করে পড়বার পর।


এই দুইজন ব্যাক্তির নাম হচ্ছে ইসহাক খান খাকওয়ানি এবং রিয়াজ আহমেদ নুন।

এর আগে আপনাদের আমি এই প্রত্যেক পাকিস্তানীদের এফিডেভিট উল্লেখ করে কার এফিডেভিটে কি কি দূর্বলতা রয়েছে সেটির একটা সিনোপসিস টেনেছিলাম আমার আগের লেখায়। কিন্তু আজকে পুনরায় সেসব এফিডেভিট আরো সুক্ষ্ণ ভাবে পড়তে গিয়ে হঠাৎ করে এমন একটি বিষয় নজরে আসলো যেটি আগে চোখে পড়েনি।

Saturday 17 October 2015

সাকার পক্ষে ৭ পাকিস্তানীর সাক্ষীঃ যে কারনে গ্রহনযোগ্য হবে না

সাকার পক্ষে নিয়োজিত লবিস্ট ডক্টর কামাল হোসেনের জামাতা ডেভিড বার্গম্যান আদা জল খেয়ে নেমেছেন এবং প্রশ্ন করছেন যে একাত্তরের ঘাতক সাকার চৌধুরীর পক্ষে পাকিস্তান থেকে দেয়া ৭ জন ব্যাক্তির এর এফিডেভিট কেন আমলে নেয়া হয়নি। এই প্রসঙ্গে প্রশ্নটা যেভাবে উত্থাপিত হয় সেটি এরকম-



আদালতে সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ না পাওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীরা সাতজন সাক্ষীর এফিডেবিট আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন, যারা নিশ্চিত করেছেন যে যুদ্ধচলাকালীন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। সেই এফিডেবিটগুলোকে ট্রাইবুনাল খারিজ করে দেয়নি, কিন্তু যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এই অযুহাতে সেগুলো আমলে নেয়নি। কেন?

আমি আমার এর আগের অনেক লেখার মধ্যে আগেই বলেছি, আইনে যে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া বলা রয়েছে সেভাবে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করতে হবে, মানে আইনের ৯(৫) ধারা মোতাবেক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালস আইনের ৯ এর উপধারা ৫ এ বলা রয়েছে-


(5) A list of witnesses for the defence, if any, along with the documents or copies thereof, which the defence intends to rely upon, shall be furnished to the Tribunal and the prosecution at the time of the commencement of the trial.

Thursday 10 September 2015

ডাঃ পিনাকী ভট্টাচার্যের আহবানের প্রেক্ষিতে আমার জবাব

কেন এই লেখা লিখছিঃ

সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক কেন্দ্রিক একটি আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। ডাঃ পিনাকী ভট্টাচার্য্য (পিনাকীদা) একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস যেটি তিনি প্রকাশ করেন ৩১ শে অগাস্ট ২০১৫। সেই স্ট্যাটাসে পিনাকীদা ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবাল (জাফর স্যার) এর ২০১৪ সালের মার্চ মাসে লিখিত “স্বাধীনতার ৪৪ বছর” শীর্ষক একটি কলামের কয়েকটি লাইনকে উদ্ধৃত করে সেটি ভিত্তি করে প্রশ্ন তুলেছেন এবং লিখেছেন-

“কিন্তু গোল্ডেন কোশ্চেন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিটা কী? সেটাও তিনি বলেছেন "(অ) সাম্প্রদায়িক দেশ তৈরি করা। অসাম্প্রদায়িকতা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিল নাকি? কোথায় ছিল? নিশ্চয় কোন দফা, দাবী বা ঘোষণায় ছিল? সেটা কোথায়?আজকে মুক্তিযুদ্ধের চুয়াল্লিশ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি একজন জাফর ইকবাল নতুন করে নির্মাণ করলে আমি সেটা মানতে বাধ্য কেন? আমি তো মানবো সেই ঘোষণাকে যা আমাদের প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্সের মাধ্যমে ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার ঘোষণা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা দাবী করা হয়েছিল সাম্য, মানবসত্তার মর্য্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করার মাধ্যমে। কে সেই ভিত্তি থেকে সরে এসেছে? জাফর ইকবাল কি মুজিবনগর সরকারের চাইতে বেশী মান্য? বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে কি অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার ঘোষণা ছিল? নাকি বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবী ছিল; বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবী ছিল? জাফর ইকবাল কোথায় পেলেন এই মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি? আমি কি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতা মানবো নাকি জাফর ইকবালের কথা মানবো?”

Monday 31 August 2015

জাফর ইকবাল স্যারের বিরুদ্ধে মাসুদ রানাদের এত ক্ষোভ কেন?

যুক্তরাজ্য প্রবাসী মাসুদ রানা পর পর দুইটি নোটে জাফর ইকবাল স্যারকে তীব্র ভাবে অনৈতিক আক্রমণ করেছেন। ব্যক্তিগত গরল, ঘৃণা উদগীরনের এটাই বোধকরি এই ধরনের মানুষের জন্য সহজ সময়। পাহাড়ের সামনে দাঁড়াবার যার সামান্যতম যোগ্যতা নেই সে-ই খুব সম্ভবত ফাঁক খোঁজে পাহাড়ের পাদদেশে ফুটো করে পাহাড়কে জয় করবার। কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে ফুটো করে নিজেকে আড়াল করা যায়,খানিকটা লুকোনো যায়, পাহাড় জয় করতে পারা যায়না।

এর মধ্যে বলে রাখা ভালো যে মাসুদ রানা এক সময় বাসদ (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল) সমর্থন করতেন বলেই বাজারে চালু রয়েছে। যদিও আমি নিশ্চিত নই। যদি হয়ে থাকে তবে সেক্ষেত্রে বলতেই হয় লুপ্ত ও বিস্মৃত দলটির এক সময়কার কর্মী আজ জাফর ইকবাল স্যারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। মেটাফোরিক বর্ণনে বলা যায় যে, সাবেক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নেতা বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী দেশের নাগরিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা আরামে আয়েশে থেকে নাদুশ নুদুশ হবার পর সাম্রাজ্যবাদ সাধারণত আরামবাদ হয়ে ওঠে।